পিআরআইয়ের সেমিনারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করছে বাংলাদেশ

দেশের অর্থনীতি এখন চাপের মুখে পড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে।

দেশের অর্থনীতি এখন চাপের মুখে পড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, খরচ বেড়ে যাওয়া এবং ঋণের উচ্চ সুদের কারণে নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ কমে গেছে। ফলে বিনিয়োগ খাতেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা এবং ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ এখন বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

গতকাল রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) কার্যালয়ে ‘মান্থলি ম্যাক্রো ইকোনমিক ইনসাইটস জুন-জুলাই-২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে এসব তথ্য জানানো হয়। পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলমের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আক্তার হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দীন চৌধুরী, মেটো চেম্বারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হাবিবুল্লাহ এন করিমসহ অনেকে।

প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে জানানো হয়, দেশে বিনিয়োগে বড় ধাক্কা দেখা গেছে। এ খাতে ধীরগতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো যন্ত্রপাতি আমদানি ২০-২৫ শতাংশ কমে গেছে। একই সঙ্গে নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে অনেকটা, যেখানে খাতটি দেশের মোট বিনিয়োগের বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে।

আশিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের শিল্প উৎপাদনের হার জুনে কিছুটা বেড়েছে, তবে তা এখনো দুর্বল পর্যায়ে আছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত এবং খনিজ খাত প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করছে না। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ উৎপাদন জুলাইয়ে আগের বছরের তুলনায় ১ শতাংশ কমে গেছে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক ধীরগতির একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাড়াচ্ছে। জুনে এলএনজি আমদানি আগের বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ আমদানিও বেড়েছে ১৩ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।’

তবে জুলাইয়ে দেশের উৎপাদন সূচক ভালো করেছে বলে জানান আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাক, নির্মাণ ও সেবা খাত কিছুটা গতি পেয়েছে। তবে বর্ষাকাল ও প্রাকৃতিক কারণে কৃষি খাতে এখনো ধীরগতি রয়েছে।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আক্তার হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার ক্ষেত্রে ৩০ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে। এ টাকা বন্ডের মাধ্যমে এবং বিদেশী কিছু সহায়তার মাধ্যমে জোগান দেয়া হবে।’

উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ এখন বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করছে জানিয়ে আক্তার হোসেন বলেন, ‘দেশের নীতিনির্ধারকদের মূল লক্ষ্য এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, যা একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়বে।’

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ শতাংশের কাছাকাছি, যা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। মূল্যস্ফীতি দ্রুত ৩-৪ শতাংশে নামিয়ে আনাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্য পূরণে নীতি সুদহার (পলিসি ইন্টারেস্ট রেট) এখন কঠোর অবস্থায় আছে এবং এটি আরো কিছুদিন অব্যাহত থাকবে। জনগণের মধ্যে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার প্রত্যাশা থাকায় নীতিনির্ধারকদের প্রতি আস্থা বাড়াতে আরো কাজ করা প্রয়োজন।’

দীর্ঘমেয়াদি মূল্য স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ ইনফ্লেশন টার্গেটিং নীতি গ্রহণ করবে বলেও জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘এর লক্ষ্য প্রতি বছর গড়ে ৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বজায় রাখা। এ নীতি কার্যকর হলে সঞ্চয়ের সুদহার প্রায় ৬ শতাংশ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে।’

বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ায় দেশে বেকারত্ব বেড়েছে। বেকারত্ব কমানোর একমাত্র উপায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি। দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় দিয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হওয়ায় বিদেশী বিনিয়োগ আনা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ এখন বিদেশ থেকে ঋণ নেয়া এবং বিদেশী কোম্পানিগুলোকে দেশে বিনিয়োগ করার জন্য উৎসাহিত করছে।’

আরও